যমুনার ভাঙনে সব হারিয়ে ছোট দোকানেই হারুনের বেঁচে থাকার লড়াই
Patrikajournal.com – ৩ হ জ র ট ক র – সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার খাসরাজবাড়ী চরের এক কোণে ছোট্ট টিনের ঘরে বসে প্রতিদিন ক্রেতার পথ চেয়ে থাকেন ২৮ বছর বয়সী মো. হারুন। ঘরের ভেতর কাঠের চৌকির ওপর সাজানো বিস্কুট, কেক, চানাচুর ও কয়েক ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। টিনের বেড়ায়ও ঝুলছে কিছু প্যাকেট। পাশে কয়েকটি প্লাস্টিকের চেয়ার, একটি কাঠের টেবিল, ফ্লাস্ক, কাপ ও চায়ের পাতা। অল্প পুঁজির এই দোকানই এখন তাঁর পরিবারের প্রধান অবলম্বন।
দোকানের মোট পণ্যের মূল্য আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকার বেশি নয়। তবু প্রতিদিনের সামান্য বিক্রিই হারুনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভালো-মন্দ মিলিয়ে দিনে তাঁর আয় হয় প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। এই টাকায় বাবা-মা ও এক ভাগনিসহ চারজনের সংসারের খরচ মেটাতে হয় তাঁকে।
নিজের ভিটা হারিয়ে অন্যের জমিতে বসবাস
হারুনের পরিবারের দুর্দশা শুধু আয়ের সংকটে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের আগের বাড়িটি ছিল নদীর কাছেই। বছর খানেক আগে যমুনার ভাঙনে সেই বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এখন তাঁরা অন্যের সাত শতাংশ জমিতে টিনের ঘর তুলে আছেন। নিজের নামে কোনো জায়গাজমি নেই বলে জানান হারুন।
“আমাদের বাড়ি নদীর পাশেই ছিল। বছর খানেক আগে নদীতে ভেঙে গেছে। এরপর অন্যের জায়গায় ঘর তুলে থাকছি। নিজের জায়গা-জমি কিছুই নেই।”
চরের মানুষের জীবনে নদীভাঙন কেবল একটি ঘর হারানোর ঘটনা নয়; এর সঙ্গে বদলে যায় জীবিকার পথ, শিক্ষার সুযোগ এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। হারুনের ক্ষেত্রেও ভাঙনের প্রভাব পড়েছে জীবনের প্রায় সব পর্যায়ে। বসতভিটা হারানোর পর পরিবারের স্থিতি নষ্ট হয়েছে, আর সামান্য আয়ের দোকানটিই হয়ে উঠেছে টিকে থাকার একমাত্র কার্যকর পথ।
পঞ্চম শ্রেণির পর থেমে যায় পড়াশোনা
শৈশবে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন হারুন। কিন্তু নদীভাঙনের পর তাঁর লেখাপড়ার ধারাবাহিকতা আর বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। পরিবারকে সামলানোর বাস্তবতায় পড়াশোনা ছেড়ে তাঁকে জীবিকার কথা ভাবতে হয়েছে। দুই বোনের মধ্যে একজনের বিয়ে হয়েছে একই গ্রামে। অন্য বোন ঢাকায় চাকরি করেন।
সকালের পর থেকেই দোকানে বসেন হারুন। বিক্রির ফাঁকে চা বানান, ছোটখাটো পণ্য গুছিয়ে রাখেন এবং আশপাশের মানুষ এলে তাঁদের প্রয়োজনমতো জিনিস দেন। দোকান পরিচালনায় তাঁর বাবা সাত্তার শেখও সহযোগিতা করেন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া বাবাকে পাশে নিয়ে এই ছোট ব্যবসা ধরে রাখার চেষ্টা তাঁর প্রতিদিনের কাজ।
প্রতিবন্ধী ভাতা হিসেবে তিন মাস পরপর ২ হাজার ৫০০ টাকা পান হারুন। দোকানের আয় ও এই ভাতা মিলিয়েই সংসারের চাল, ডাল, ওষুধসহ প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হয়। কিন্তু চারজনের পরিবারের জন্য এই অর্থ যথেষ্ট নয়।
“দোকানের আয় আর তিন মাস পরপর ২ হাজার ৫০০ টাকা প্রতিবন্ধী ভাতা পাই। সব মিলিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হয়।”
ভাঙনের সঙ্গে ভেঙেছে সংসারও
হারুনের ব্যক্তিগত জীবনেও রয়েছে বেদনার অভিজ্ঞতা। চার বছর আগে তিনি বিয়ে করেছিলেন। তবে এক বছরের মাথায় স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। তাঁর ধারণা, অর্থনৈতিক অনটনের কারণেই দাম্পত্য জীবন টেকেনি। জীবনের এই ধাক্কা সামলেও তাঁকে বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে।
বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দিকে তাকালে তাঁর কষ্ট আরও বেড়ে যায়। তাঁদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য খুব বেশি কিছু করার সামর্থ্য নেই, অথচ পরিবারের হাল ধরার দায়িত্ব তাঁর কাঁধেই। অল্প পুঁজির দোকানে প্রতিটি বিক্রি তাই শুধু আয় নয়, পরিবারের পরের দিনের খাবার ও প্রয়োজন মেটানোর সম্ভাবনা।
“বাবা-মা বৃদ্ধ হয়ে গেছে। তাঁদের কষ্ট দেখলে ভালো লাগে না।”
যমুনার তীরের সেই দোকানে কখনো কেউ কয়েক টাকার বিস্কুট কেনেন, কেউ চানাচুর নেন, আবার কেউ এক কাপ চা পান করেন। ক্ষুদ্র এসব কেনাবেচা জমিয়েই দিনের আয় হয়। ক্রেতা কম এলে আয়ও কমে যায়; তবু দোকান বন্ধ করার উপায় নেই। কারণ এই জায়গাটিই হারুনের কাজের ক্ষেত্র, আর এই আয়ের ওপরই নির্ভর করছে পরিবারের প্রতিদিনের জীবন।
নিজের চেয়ে চরের মানুষের কষ্টের কথাই বেশি ভাবনা
সরকারের কাছে নিজের জন্য কোনো প্রত্যাশা আছে কি না—এমন প্রশ্নে হারুন ব্যক্তিগত চাহিদার কথা আগে বলেন না। তাঁর ভাবনায় আসে খাসরাজবাড়ী চর ও আশপাশের মানুষের দুর্ভোগ। নদীভাঙনে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে, অনেকে অনিশ্চিত অবস্থায় দিন পার করছে। এই সমস্যাগুলো খোঁজ নিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি খুশি হবেন বলে জানান।
হারুনের কথায় স্পষ্ট হয়, তাঁর ব্যক্তিগত সংকটের পাশাপাশি চরাঞ্চলের সামগ্রিক অনিশ্চয়তাও তাঁকে ভাবায়। যাঁদের বসতভিটা নদীতে চলে গেছে, তাঁদের জন্য নিরাপদ আবাসন ও জীবিকার সুযোগ কতটা জরুরি—তাঁর জীবনই তার একটি বাস্তব উদাহরণ। ভাঙনে জমি হারালে মানুষের আয়ের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে; তখন সামান্য পুঁজির দোকান, দিনমজুরি বা অনিয়মিত কাজই অনেক পরিবারের ভরসা হয়ে দাঁড়ায়।
প্রমত্তা যমুনা হারুনের পরিবারের ভিটেমাটি কেড়ে নিয়েছে। থেমে গেছে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, আর্থিক সংকটে টেকেনি দাম্পত্য জীবনও। কিন্তু সব প্রতিকূলতার মধ্যে তিনি দোকান সাজিয়ে বসেন প্রতিদিন। কয়েক হাজার টাকার পণ্য, কিছু চা-পাতা আর সীমিত ক্রেতার ভিড় নিয়েই তিনি চেষ্টা করছেন সংসারটিকে টিকিয়ে রাখতে।
খাসরাজবাড়ী চরের ছোট টিনের দোকানটি তাই শুধু কেনাবেচার স্থান নয়; এটি হারুনের দায়িত্ব, আত্মসম্মান এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। প্রতিটি বিক্রি তাঁর কাছে নতুন দিনের আশ্বাস—আজকের আয়েই হয়তো বাবা-মা ও ভাগনিকে নিয়ে পরিবারের আরেকটি দিন চলবে।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is ৩ হ জ র ট ক র?
৩ হ জ র ট ক র is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does ৩ হ জ র ট ক র matter?
৩ হ জ র ট ক র matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.

