কমলনগরে মেঘনার বুকে নতুন চর, পুরোনো ভূমিমালিকদের আশা ও দখল-উদ্বেগ
Patrikajournal.com – লক ষ ম প র র কমলনগর – লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার সাহেবেরহাট ইউনিয়নের দক্ষিণ জগবন্ধু এলাকায় মেঘনা নদীর বুকে বড় একটি নতুন চর দৃশ্যমান হয়েছে। উর্বর পলিমাটির এই চরে ইতিমধ্যে সবুজ ঘাস জন্মেছে। দীর্ঘদিন নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারানো মানুষের কাছে এটি নতুন আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। তবে চরটি পুরোপুরি জেগে ওঠার আগেই স্থানীয় একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকদের মধ্যে।
কমলনগরের বহু পরিবার বছরের পর বছর মেঘনার ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়েছে। বসতভিটা হারিয়ে অনেকে অন্য এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন, আবার কৃষিজমি হারিয়ে জীবিকার পথও সংকুচিত হয়েছে অনেকের। নদীগর্ভে চলে যাওয়া ভূমির কিছু অংশে নতুন করে চর জাগায় পুরোনো মালিকেরা নিজেদের জমি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন। তাঁদের আশঙ্কা, সুষ্ঠু জরিপ ও বিধিবদ্ধ বন্দোবস্তের আগেই দখল প্রতিষ্ঠিত হলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা আবারও বঞ্চিত হবেন।
দুই দশকের ভাঙনে বদলে যাওয়া জনপদ
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে অব্যাহত ভাঙনে কমলনগর উপজেলার প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকা মেঘনায় বিলীন হয়েছে। ২০১৩ ও ২০১৪ সালের দিকে চর কালকিনি এবং সাহেবেরহাট ইউনিয়নের বড় অংশ নদীতে হারিয়ে যায়। চর ফলকন, পাটওয়ারীর হাট ও চর লরেন্স ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকাও একইভাবে ভাঙনের শিকার হয়েছে।
এই ভাঙন কেবল জমির সীমানা বদলায়নি; বহু পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থাও পাল্টে দিয়েছে। যাঁদের চাষের জমি ছিল, তাঁদের অনেকেই জমিহীন হয়েছেন। কারও বসতভিটা বারবার সরাতে হয়েছে, কেউ আবার স্থায়ীভাবে এলাকা ছেড়েছেন। ফলে নতুন চরের প্রশ্নটি স্থানীয়দের কাছে শুধু জমির দাবি নয়, হারিয়ে যাওয়া জীবিকা ও নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।
দক্ষিণ জগবন্ধুর নতুন চরটি প্রায় তিন বছর ধরে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকদের দাবি, এ এলাকার পূর্বের সীমানার সঙ্গে তাঁদের জমির সম্পর্ক রয়েছে এবং স্থানীয় মাতব্বর গোষ্ঠীর সেখানে বৈধ মালিকানা নেই। তা সত্ত্বেও চরটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
ঐক্য পরিষদের উদ্যোগ
নতুন চরকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য বিরোধ ও জবরদখল ঠেকাতে জগবন্ধু, ফলকন ও পাটওয়ারীর হাটের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ একত্রিত হয়েছেন। তাঁরা গঠন করেছেন ‘চর জগবন্ধু, ফলকন ও পাটওয়ারীর হাট ভূমিমালিক ঐক্য পরিষদ’। সংগঠনটির লক্ষ্য হলো প্রকৃত ভূমিমালিকদের স্বার্থ রক্ষা, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জমি বন্দোবস্তের দাবি জানানো।
দক্ষিণ জগবন্ধু ভূমিমালিক সমিতির সভাপতি জহির উদ্দিন রিয়াজ মনে করেন, নতুন চরটির অবস্থান নিয়ে স্থানীয় ইতিহাস ও সীমানা বিবেচনা করা জরুরি। তিনি বলেন,
“সাহেবেরহাট ইউনিয়নের দক্ষিণ জগবন্ধুর নিজস্ব সীমানায় নতুন এই চর জেগে উঠেছে। এতে মাতব্বরদের কোনো জমি নেই। প্রকৃত ভূমিমালিকেরা যেন শান্তিপূর্ণভাবে চাষাবাদ করতে পারেন, আমরা সেই চেষ্টা করছি।”
পাটওয়ারীর হাট ইউনিয়নের ভূমিমালিক সমিতির নেতা জাহাঙ্গীর মেম্বারও ক্ষতিগ্রস্তদের ঐক্যবদ্ধ থাকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত জগবন্ধু, ফলকন ও পাটওয়ারীর হাটের মানুষকে সংগঠিত করে সুশৃঙ্খল পরিস্থিতি বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। তবে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী বলপ্রয়োগে জমি ভোগদখলের উদ্যোগ নিচ্ছে বলে তাঁরা জানতে পারছেন।
সাহেবেরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে অতীতে একটি চর দখল করে সুবিধা নিয়েছিল মাতব্বরেরা। তাঁর আশঙ্কা, দক্ষিণ জগবন্ধুর সদ্য জেগে ওঠা চরটির ক্ষেত্রেও প্রকৃত ভূমিমালিকদের বাদ দিয়ে একই ধরনের চেষ্টা হতে পারে।
আগের চরের নিয়ন্ত্রণ ও ইজারার অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার কটোরিয়া ও কাঁকড়ার চর এলাকায় প্রায় পাঁচ বছর আগে জেগে ওঠা আনুমানিক ৬০০ একর জমি বর্তমানে স্থানীয় মাতব্বর গোষ্ঠীর দখলে রয়েছে। ওই চর ভোলার চরফ্যাশনের বাসিন্দা সকেট জামালের কাছে এক বছরের জন্য ৩৪ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ অভিযোগ অস্বীকার না করে মাতব্বর বংশের পক্ষে খোকন মাতব্বর দাবি করেন, তাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকা চরটি তাঁদের পূর্বপুরুষ ও আত্মীয়স্বজনের চাষাবাদের জমি ছিল। তাঁর ভাষ্য, নতুন করে জেগে ওঠা চরের এলাকাতেও তাঁদের বসতবাড়ি ছিল, তাই সেখানে দাবি থাকা স্বাভাবিক।
“এককভাবে যে চরটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেটি আমাদের পূর্বপুরুষ ও আত্মীয়স্বজনের চাষাবাদের জমি। নতুন করে জেগে ওঠা চরটিতে আমাদের বসতবাড়ি ছিল। তাই ওই চরে আমাদের দাবি থাকাটা স্বাভাবিক।”
৩৪ লাখ টাকায় চর ইজারা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে খোকন মাতব্বর বলেন, সেখানে অন্য কারও জমি নেই। তাই ওই জমিতে তাঁরা কী করবেন, সেটি তাঁদের নিজস্ব বিষয়।
জরিপের আগে মালিকানা নয়
চরের জমি নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জরিপ ও বিধিবদ্ধ বন্দোবস্তের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাহাত উজ জামান জানিয়েছেন, চরটি সম্পূর্ণভাবে জেগে উঠলে সেখানে জরিপ করা হবে। জরিপ শেষে প্রচলিত বিধি মেনে বন্দোবস্ত দেওয়া হবে।
“চর পুরোপুরি জেগে উঠলে জরিপ পরিচালনা করা হবে। এরপর বিধি অনুযায়ী তা বন্দোবস্ত দেওয়া হবে। এর আগে চরের ওপর কারও মালিকানা দাবি করার সুযোগ নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন চর জাগা এবং পুরোনো ভূমি হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা কমলনগরের মানুষের পরিচিত বাস্তবতা। কিন্তু নতুন ভূমি কার দখলে যাবে, সেটি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সামাজিক উত্তেজনাও বাড়তে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রত্যাশা, চরের সীমানা নির্ধারণ, জরিপ এবং বন্দোবস্তের পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হবে; যাতে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত ভূমিমালিকেরা ন্যায্য সুযোগ পান এবং নতুন করে দখলবাজির অভিযোগ না ওঠে।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is লক ষ ম প র র কমলনগর?
লক ষ ম প র র কমলনগর is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does লক ষ ম প র র কমলনগর matter?
লক ষ ম প র র কমলনগর matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.

