Patrikajournal
Fast mobile article powered by Nexiamath-SEO AMP.
AMP Article

সড়কের দুপাশে সবুজ বিপ্লব কলেজশিক্ষকের

Published October 5, 2026 · Updated October 5, 2026 · By Betty Moore - patrikajournal.com

Foto : Betty Moore - patrikajournal.com

মদনপুরের পথঘাটে এক শিক্ষকের সবুজ স্বপ্ন

Patrikajournal.com – সড়ক র দ প শ সব জ - যশোর শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে ঝিকরগাছা উপজেলার মদনপুর গ্রাম। গ্রামের বটতলা মোড় পেরিয়ে দক্ষিণে রাজগঞ্জ বাজারের দিকে এগোলে চোখে পড়ে অন্য রকম এক দৃশ্য। পিচঢালা সড়কের দুই ধারে দূর পর্যন্ত সারিবদ্ধ তালগাছ, ছোট-বড় নানা গাছের সবুজ উপস্থিতি। এই দৃশ্য কোনো এক দিনের কর্মসূচির ফল নয়; দীর্ঘ সময় ধরে নিজের উদ্যোগে গাছ লাগিয়ে চলা এক কলেজশিক্ষকের শ্রমের চিহ্ন এটি।

মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সফিয়ার রহমান স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত ‘গাছপাগল শিক্ষক’ নামে। সরকারি প্রকল্প বা কোনো প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী অনুদানের ওপর নির্ভর না করে তিনি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সড়কের ধার, রেললাইনসংলগ্ন এলাকা, নদীতীর এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনায় বীজ ও চারা রোপণ করে আসছেন। চলতি বছর তিনি কলেজের চাকরি থেকে অবসরে যাচ্ছেন, তবে তাঁর রোপণ করা গাছগুলো বহু বছর ধরে এলাকার পথচলার সঙ্গী হয়ে থাকবে।

গাছ লাগানোর ভাবনা ও উদ্দেশ্য

সফিয়ার রহমানের কাছে বৃক্ষরোপণ কেবল সৌন্দর্য তৈরির কাজ নয়। তিনি মনে করেন, রাস্তার পাড়ে গাছ থাকলে সড়কের মাটি ধরে রাখতে সহায়তা হয়। তালগাছ বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তাঁর বিশ্বাস। পাশাপাশি সবুজ পরিবেশ পথের সৌন্দর্য বাড়ায় এবং রাস্তা ব্যবহারকারীদের জন্য পরিচিত একটি দৃশ্যমান সীমারেখা তৈরি করে।

“আমার দেখাদেখি একজন মানুষও যদি একটি গাছ রোপণ করেন এবং সেটির যত্ন নেন, তাহলেই আমার এই দীর্ঘদিনের পরিশ্রম সার্থক হবে।”

তাঁর লক্ষ্য তাই শুধু হাজার হাজার বীজ ছড়িয়ে দেওয়া নয়; মানুষকে গাছ রোপণ ও পরিচর্যার প্রতি আগ্রহী করে তোলা। একটি গাছের বেঁচে থাকা, বড় হয়ে ওঠা এবং ভবিষ্যতে পরিবেশে অবদান রাখাই তাঁর কাজের আসল প্রাপ্তি।

নব্বইয়ের দশকে শুরু

এই সবুজ উদ্যোগের শিকড় নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯১ সালে সফিয়ার রহমান ঝিকরগাছার পারবাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। সে সময় দেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চলছিল। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি বারবাকপুর বিলপাড়ের সড়কঘেঁষা এলাকায় শিশুগাছ ও জামগাছের বহু চারা লাগান।

সময়ের সঙ্গে অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও কয়েকটি জামগাছ এখনো সেই প্রথম দিকের উদ্যোগের স্মৃতি বহন করছে। একটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীভিত্তিক কার্যক্রম কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশচর্চার সূচনা হতে পারে, ওই গাছগুলো তারই নীরব সাক্ষ্য।

১৯৯৬ সালে পারবাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছেড়ে তিনি মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজে যোগ দেন। নতুন কর্মস্থলে আসার পর নিজের গ্রাম ও আশপাশের এলাকাকে কেন্দ্র করে গাছ লাগানোর পরিসর আরও বাড়ান। ধীরে ধীরে রাস্তার পাশের ফাঁকা জায়গা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ এবং জনপদের বিভিন্ন অংশ তাঁর সবুজ পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত হয়।

এক কৃষকের কাজ থেকে নতুন প্রেরণা

২০১৪ সালের দিকে তাঁর কর্মকাণ্ডে বিশেষ একটি মোড় আসে। সাংবাদিক রুকুনউদ্দৌলা ও শাহাদত হোসেন কবিলের মাধ্যমে মনিরামপুরের খর্দ গ্রামের রুহুল গাজীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। রুহুল গাজী লাঙল চাষের কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে কপোতাক্ষ নদের তীরে তালবীজ পুঁতে দিতেন।

একজন কৃষকের এমন স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ সফিয়ার রহমানকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। তিনি ভাবেন, প্রকৃতির প্রতি একজন সাধারণ কৃষক যদি এত দায়িত্বশীল হতে পারেন, তাহলে একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁরও আরও বিস্তৃত ভূমিকা থাকা দরকার। এরপর তিনি তাল ও খেজুরগাছ রোপণকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে শুরু করেন।

কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রায় ১০০টি তালবীজ রোপণ করেছিলেন তিনি। সেসব বীজ থেকে বর্তমানে ২৫ থেকে ৩০টি তালগাছ রাস্তার ধারে বেড়ে উঠেছে। প্রায় ১২ বছর পর ওই গাছে ফলও এসেছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর একটি বীজের গাছে পরিণত হওয়া তাঁর কর্মযজ্ঞের বাস্তব ফলাফলকে দৃশ্যমান করে।

সড়কজুড়ে তাল, খেজুর ও দেবদারু

২০১৬ সালের দিকে ঝিকরগাছা-রাজগঞ্জ সড়কে আম, জাম ও কাঁঠালের সঙ্গে প্রায় ১০ হাজার তালবীজ রোপণ করেন সফিয়ার রহমান। এত বড় উদ্যোগের সব গাছ টিকে থাকেনি, তবে প্রায় এক হাজার গাছ এখনো জীবিত রয়েছে। পথের ধারের গাছকে টিকিয়ে রাখা যে কেবল রোপণের ওপর নির্ভর করে না, বরং প্রাকৃতিক পরিস্থিতি ও পরিচর্যার সঙ্গেও জড়িত—এ বাস্তবতাও এখানে স্পষ্ট।

মনিরামপুরের খড়িঞ্চা-রাজগঞ্জ সড়কের পাশে দুই বছরে প্রায় দুই হাজার খেজুরগাছ লাগিয়েছেন তিনি। শৈলি, বসন্তপুর ও তেঁতুলিয়া সড়কেও তাঁর হাতে ছড়ানো হয়েছে আনুমানিক ১০ হাজার দেবদারুর বীজ। পুলেরহাট-রাজগঞ্জ সড়কে প্রশাসনের লাগানো গাছ নষ্ট হয়ে ফাঁকা জায়গা তৈরি হলে তিনি সেখানে নতুন করে তালবীজ পুঁতেছেন।

এই কাজের ফলে সড়কের ধার শুধু খালি জমি হিসেবে পড়ে থাকে না; ধীরে ধীরে তা সবুজ আবরণের সুযোগ পায়। একটি এলাকায় ছায়া, পাখির আশ্রয় এবং পরিচিত প্রাকৃতিক দৃশ্য গড়ে উঠতে সময় লাগে, আর সেই সময়কে সামনে রেখেই তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সবুজের পাঠ

সফিয়ার রহমানের উদ্যোগের একটি বড় অংশ শিক্ষাঙ্গনকে ঘিরে। মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজ প্রাঙ্গণে তিনি ৩০ থেকে ৩৫টি তালগাছের পাশাপাশি বটসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়েছেন। কলেজে রোপণ করা একটি বটগাছের নাম তিনি দিয়েছেন ‘জ্ঞানবৃক্ষ’। নামটির মধ্যে শিক্ষা ও প্রকৃতির সম্পর্ককে সামনে আনার একটি প্রতীকী চেষ্টা রয়েছে।

যশোর টিচার্স ট্রেনিং কলেজে বিএড পড়ার সময় তাঁর নেতৃত্বে ২০টি পেয়ারা গাছও লাগানো হয়েছিল। তিনি কখনো কখনো নিজের লাগানো গাছের ছায়ার নিচে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেন। ফলে গাছ তাঁর কাছে পাঠ্যবইয়ের বাইরের পরিবেশশিক্ষারও অংশ হয়ে ওঠে।

সম্প্রতি মদনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তিনি ৩০ কেজি খেজুরের বীজ সংগ্রহ করেন। পরে বসন্তপুর, দিঘিরপাড়, তেঁতুলিয়া মোড় হয়ে খাটুরা বাজার পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় সেগুলো রোপণ করা হয়। শিশুদের এই অংশগ্রহণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গাছের সঙ্গে বাস্তব সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ দেয়।

রেলপথের পাশেও বীজ ছড়ানোর উদ্যোগ

সড়ক ও বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের বাইরে রেললাইনের পাশেও তাঁর আগ্রহ রয়েছে। সম্প্রতি বেনাপোল থেকে বাগেরহাটের মোংলাগামী ট্রেনে যাত্রার সময় রেললাইনের দুই পাশে কয়েক লাখ খেজুরের বীজ ছড়িয়ে দেন তিনি। তাঁর এই উদ্যোগে কখনো শুভানুধ্যায়ী, কখনো প্রবাসী ব্যক্তি, আবার কখনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সহযোগিতা করেছে।

মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. সফিকুল ইসলাম সফিয়ার রহমানকে ব্যতিক্রমী একজন শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, সফিয়ার রহমান আনন্দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পড়ান এবং পরিবেশ রক্ষার কাজে অন্যদেরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

“একজন ব্যতিক্রম শিক্ষক সফিয়ার রহমান। তিনি আনন্দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেন। কখনো কখনো তাঁর রোপণ করা গাছের নিচেও পাঠদান করেন তিনি। পরিবেশ রক্ষায় সফিয়ারের মতো অন্যদেরও এগিয়ে আসা উচিত।”

অবসরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও সফিয়ার রহমানের পরিচয় কেবল একজন শিক্ষক হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর লাগানো গাছগুলো মদনপুর ও আশপাশের জনপদে এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে—প্রকৃতির জন্য বড় কাজ শুরু হতে পারে একটি বীজ, একটি চারা এবং একজন মানুষের নিয়মিত দায়িত্ববোধ থেকে।

Related Reading

Frequently Asked Questions

What is সড়ক র দ প শ সব জ?

সড়ক র দ প শ সব জ is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.

Why does সড়ক র দ প শ সব জ matter?

সড়ক র দ প শ সব জ matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.