Bangladesh

এক দশকের চিত্র: অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ৭৫ জনের মৃত্যু

rail-crossing

যশোরের রেলক্রসিংগুলোতে বাড়ছে প্রাণহানির শঙ্কা

Patrikajournal.com – এক দশক র চ ত র – যশোরের বিভিন্ন রেলক্রসিংয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরে পথচারী ও যানবাহনচালকদের ঝুঁকিতে ফেলছে। অনুমোদনহীন পারাপার, গেটম্যানের অভাব এবং দুর্বল সতর্কতাচিহ্নের কারণে এক দশকে এ এলাকায় ৪৫টি দুর্ঘটনায় ৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বহু ক্রসিং কার্যত মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সর্বশেষ কয়েকটি দুর্ঘটনাও সেই ঝুঁকির ভয়াবহতা সামনে এনেছে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর যশোর সদরের কৃষ্ণবাটি রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় ট্রেনের ধাক্কায় একটি ইজিবাইক বিধ্বস্ত হয়। ঘটনাস্থলেই ইজিবাইকচালক আজিজুর রহমান এবং যাত্রী এরশাদ আলীর মৃত্যু হয়।

এর আগে ১০ মে অভয়নগরের ভাঙ্গাগেট এলাকায় কয়লাবোঝাই একটি ট্রাককে ধাক্কা দেয় ট্রেন। ধাক্কার পর ট্রাকটি প্রায় আধা কিলোমিটার পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায় ট্রেনটি। চালক মনোয়ার হোসেন ঘটনাস্থলেই মারা যান। তাঁর সহকারী রায়হান গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেন।

১৮৩ ক্রসিংয়ের বড় অংশই অরক্ষিত

বাংলাদেশ রেলওয়ের পাকশী বিভাগের পশ্চিমাঞ্চলের তথ্য বলছে, যশোর রেলওয়ে স্টেশন থেকে যশোর-বেনাপোল, যশোর-কোটচাঁদপুর এবং যশোর-খুলনা রুটের যশোর অংশে মোট ১৮৩টি রেলক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে ১০১টিই অবৈধ। অনুমোদিত ৮২টি পারাপারও পুরোপুরি নিরাপদ নয়; ৩৮টিতে কোনো গেটম্যান নেই।

এই পরিস্থিতিতে ট্রেন চলাচলের সময় মানুষকে নিজের ঝুঁকিতেই রেললাইন অতিক্রম করতে হচ্ছে। অনেক স্থানে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড থাকলেও সেগুলোর লেখা মুছে গেছে বা বোর্ডগুলো নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ফলে দূর থেকে আসা মানুষ কিংবা নতুন চালকদের জন্য বিপদের মাত্রা আরও বাড়ে।

রেলক্রসিংয়ে গেটবার, সংকেত বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী না থাকলে চালক ও পথচারীকেই ট্রেনের উপস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু বাঁক, দৃশ্যমানতার সীমাবদ্ধতা, ব্যস্ত সড়ক এবং দ্রুতগতির যানবাহনের কারণে সেই সিদ্ধান্তের জন্য অনেক সময়ই পর্যাপ্ত সুযোগ থাকে না।

বেনাপোল ও কোটচাঁদপুর রুটে উদ্বেগ

যশোর-বেনাপোল রেললাইনে ২৮টি রেলক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র চারটি স্থানে গেটবার দেখা গেছে; বাকি ২৪টি পারাপারে এমন সুরক্ষা নেই। ফলে রিকশা, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল, ভ্যান এবং পথচারীরা প্রতিদিন অনিশ্চয়তা নিয়ে রেললাইন পার হন।

যশোর-কোটচাঁদপুর রুটের খড়কি এলাকায় আধা কিলোমিটারের মধ্যে সাতটি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। রেলওয়ের দৃষ্টিতে সবগুলোই অবৈধ। স্থানীয়দের বক্তব্য, এলজিইডির সড়ক নির্মাণের সময় এসব পারাপারের সৃষ্টি হয়।

খড়কি ধোপাপাড়ার সড়কটি যশোর পৌরসভার দক্ষিণাংশের বহু মানুষের শহরে আসা-যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই সড়ককে কেটে গেছে যশোর-কোটচাঁদপুর রেলপথ। অথচ সেখানে গেটম্যান নেই। সতর্কবার্তার বোর্ড থাকলেও তা স্পষ্টভাবে পড়া যায় না।

গত বুধবার সকালে ওই এলাকায় দেখা গেছে, রিকশা, ইজিবাইক ও ব্যক্তিগত যানবাহন নিয়মিতভাবে লাইন পার হচ্ছে। এরই মধ্যে কোনো কোনো সময় সাইরেন বাজিয়ে ট্রেন চলে যাচ্ছে। নিরাপদ পারাপারের জন্য অপেক্ষা বা যানবাহন নিয়ন্ত্রণের নির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা সেখানে চোখে পড়েনি।

রেললাইন পার হতে গিয়ে এখানে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেই চলছে। এখানে বড় একটি বাঁক আছে, ফলে ট্রেন দেখা যায় না। স্থানটি খুবই দুর্ঘটনাপ্রবণ।

স্থানীয় বাসিন্দা সাহেব আলীর এই বক্তব্যে খড়কির সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে। বাঁক থাকলে ট্রেন আসছে কি না, তা আগে থেকে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। আর ব্যস্ত পারাপারে কয়েক সেকেন্ডের ভুলই বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

তপপিডাঙ্গা এলাকার ভ্যানচালক আলম জানান, কখনো কখনো স্থানীয়রাই দাঁড়িয়ে অন্যদের সতর্ক করেন।

এই গেটে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। গেটম্যান না থাকায় আমরা একজন দাঁড়িয়ে গেটম্যানের দায়িত্ব পালন করি। যখন কেউ থাকে না, তখন ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেই।

দপ্তরগুলোর মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে টানাপোড়েন

রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিকল্পনা ছাড়া বিভিন্ন স্থানে সড়ক তৈরি হওয়ায় অনুমোদনহীন ক্রসিংয়ের সংখ্যা বাড়ছে। তাদের দাবি, পৌরসভা, এলজিইডি বা স্থানীয় উদ্যোগে তৈরি কিছু পারাপার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার জন্ম দিয়েছে। সড়ক নির্মাণের আগে ও পরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে চিঠি দেওয়া হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে রেল বিভাগের বক্তব্য।

অবৈধ গেটগুলো ব্যবহারের কারণে ঝুঁকি বাড়ছে। কোথাও কোথাও এসব ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিং সৃষ্টি করেছে পৌরসভা, এলজিইডি কিংবা স্থানীয়রা। সড়ক নির্মাণের আগে ও পরে আমরা এসব দপ্তরে চিঠি দিলেও বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ পথ। এগুলোর বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রেলের যশোর অঞ্চলের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী চাঁদ আহমেদ এভাবেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। অন্যদিকে এলজিইডির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের আওতাধীন সড়কের রেলক্রসিংয়ে গেটম্যান দেওয়ার জন্য রেল বিভাগকে আগেই জানানো হয়েছিল।

২০১৮ সালে গেটম্যান দিতে রেল বিভাগকে অবহিত করা হয়। সেই চিঠির এখন কী অবস্থা, সেটা আমার জানা নেই।

যশোর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের এই বক্তব্যে দুই সরকারি দপ্তরের যোগাযোগ ও সমন্বয়ের ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এক দপ্তর অন্য দপ্তরের দিকে দায়িত্ব ঠেলে দেওয়ায় বছরের পর বছর কার্যকর সমাধান আসছে না।

নিরাপদ পারাপারে জরুরি উদ্যোগের দাবি

বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রুহুল আমিন মনে করেন, সমন্বয়ের অভাবেই অবৈধ পারাপারের বিস্তার ঘটছে। তাঁর মতে, প্রয়োজনহীন বা বিপজ্জনক ক্রসিং বন্ধ করা এবং প্রয়োজনীয় স্থানে নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করা জরুরি।

সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। ফলে দিন দিন বাড়ছে অবৈধ এসব ক্রসিং। এসব ক্রসিং একেকটা মৃত্যুর ফাঁদ। দ্রুত এসব ক্রসিং বন্ধ করা কিংবা যাতায়াত নিরাপদ করতে উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি মানুষেরও সচেতন হতে হবে।

রেললাইন পার হওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের সতর্কতাও গুরুত্বপূর্ণ। ট্রেন দেখা না গেলেও তার শব্দ শোনা, উভয় দিকে তাকানো, দ্রুত পার হতে গিয়ে ঝুঁকি না নেওয়া এবং ট্রেনের কাছাকাছি অবস্থায় লাইন অতিক্রম না করা দুর্ঘটনা কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে ব্যক্তিগত সতর্কতা কখনোই গেটম্যান, গেটবার ও কার্যকর সংকেতব্যবস্থার বিকল্প নয়।

যশোরের ১৮৩টি রেলক্রসিংয়ের বাস্তবতা দেখাচ্ছে, নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে দ্রুত যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। কোন পারাপার বৈধ, কোনটি বন্ধ করা দরকার, কোথায় গেটম্যান ও গেটবার বসানো জরুরি—এসব বিষয়ে রেল বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সড়ক নির্মাণকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত সিদ্ধান্ত ছাড়া প্রাণহানি ঠেকানো কঠিন হবে।

Frequently Asked Questions

What is এক দশক র চ ত র?

এক দশক র চ ত র is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.

Why does এক দশক র চ ত র matter?

এক দশক র চ ত র matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *