জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কৃষির নির্গমন কমানো জরুরি
Patrikajournal.com – ক ষ ও গ র নহ উস – জলবায়ু পরিবর্তন এখন দূরের কোনো আশঙ্কা নয়; দুর্যোগের ঘনঘটা তার বাস্তব প্রমাণ হয়ে উঠছে। হিমবাহ ভেঙে আকস্মিক বন্যা, অস্বাভাবিক বর্ষণ, প্রচণ্ড ঝড় ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত—সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলো পৃথিবীর পরিবেশগত অস্থিরতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। একই সময়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি, কৃষির ক্ষয়ক্ষতি এবং মানুষের জীবন ও জীবিকার অনিশ্চয়তা।
নেপাল-তিব্বত অঞ্চলে হিমবাহধসের পর হওয়া আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানি, নিখোঁজ হওয়া এবং অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে। জাপানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের দুই মিলিয়নের বেশি মানুষকে মৌসুমি ঝড় ও ভারী বৃষ্টির সময়ে নিরাপদ স্থানে যেতে বলা হয়েছিল। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইন্দোনেশিয়ার মাউন্ট আনাক ক্রাকাতাউয়ে ধারাবাহিক অগ্ন্যুৎপাত ছাইয়ের ঘন মেঘ তৈরি করে; এর প্রভাবে কয়েকটি বিমানবন্দর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যাতায়াতব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে।
এ ধরনের বড় ঘটনার বাইরেও বহু দেশে সময়ের বাইরে বৃষ্টি, দীর্ঘ তাপপ্রবাহ, তীব্র ঝড় ও বন্যার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরের বর্তমান এল নিনো আগামী বছর মানুষের জীবদ্দশায় দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ নিতে পারে—এমন সতর্কতা দিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেট অফিস। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়লে পরিস্থিতি গত ৫০০ থেকে ১ হাজার বছরের মধ্যে অন্যতম তীব্র পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা।
উষ্ণতার পেছনে গ্রিনহাউস গ্যাস
বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বাড়ার প্রধান কারণ গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি। এই গ্যাসগুলোর মধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড ও মিথেন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি ব্যবহার এবং শক্তি খাত বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণের সবচেয়ে বড় উৎস; এর অংশ প্রায় ৩১ শতাংশ। শিল্প খাত রয়েছে পরের অবস্থানে। কৃষির অবদান ৬ দশমিক ৬ শতাংশ হলেও বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশের জন্য এই অংশকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
কৃষি শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত খাত নয়, নির্গমনেরও একটি উৎস। অতিরিক্ত ইউরিয়া ও অন্যান্য নাইট্রোজেনভিত্তিক সার ব্যবহারে নাইট্রাস অক্সাইড তৈরি হয়। অন্যদিকে ধানখেত, জলাভূমি, মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্র এবং গবাদিপশু পালন থেকে মিথেন বের হয়। মিথেনের পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় কম মনে হলেও উষ্ণতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের কৃষিতে মিথেনের চাপ
বাংলাদেশ থেকে বছরে আনুমানিক ৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন মিথেন নির্গত হয়। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে এ দেশের অংশ প্রায় শূন্য দশমিক ৪২ থেকে শূন্য দশমিক ৪৩ শতাংশ। আন্তর্জাতিক হিসাবের বিচারে এই হার আধা শতাংশেরও কম। কিন্তু দেশের নিজস্ব নির্গমন কাঠামোতে কৃষির ভূমিকা অনেক বড়: মোট গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রায় ৪৪ শতাংশ আসে কৃষি খাত থেকে। কৃষিজাত নির্গমনের মধ্যে ধানখেতের অংশ প্রায় ৩০ শতাংশ।
ফলে খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রেখে ধান উৎপাদনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা সময়ের দাবি। বাংলাদেশে ধান প্রধান খাদ্যশস্য এবং বিপুলসংখ্যক কৃষকের আয়ের উৎস। তাই নির্গমন কমানোর উদ্যোগ এমন হতে হবে, যাতে কৃষকের ব্যয় অযথা না বাড়ে, ফলন ঝুঁকিতে না পড়ে এবং মাঠপর্যায়ে পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
ঢাকায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইফাদের আয়োজিত ‘বাংলাদেশে জলবায়ু সহনশীলতা ও স্বল্প-নির্গমন কৃষিব্যবস্থার লক্ষ্যে মিথেন নিঃসরণ হ্রাস ত্বরান্বিতকরণ’ শীর্ষক কর্মশালায় এই বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ ও নেপালের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ হুমনাথ ভান্ডারি সেখানে কৃষি থেকে নির্গমন কমানোর সম্ভাবনা, বাস্তব চ্যালেঞ্জ এবং ২০৩৫ সালের লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা করেন।
মাঠপর্যায়ে কী বদল আনা যায়
কম মিথেন নির্গত হয় এমন ফসলের জাত উদ্ভাবন ও ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। একই সঙ্গে ফসলের ধরন ও চাষপদ্ধতি নির্বাচনেও পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে। কৃষিবিজ্ঞানী, সম্প্রসারণকর্মী ও কৃষকের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই পরিবর্তন বিস্তৃত করা কঠিন। গবেষণাগারের প্রযুক্তিকে সহজ ভাষায়, কম খরচে এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে কৃষকের হাতে পৌঁছে দিতে হবে।
ধানচাষে জমি দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবিয়ে রাখার বদলে পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানোর ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। এই পদ্ধতিতে সেচের পানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি মিথেন উৎপাদনের পরিবেশও কমে। ড্রিপ ও স্প্রিংকলারের মতো সেচসাশ্রয়ী প্রযুক্তি অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রেও পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ করতে পারে।
সারের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য দরকার। ইউরিয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে জৈব সার ও বায়োচার ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। গুটি ইউরিয়ার মতো প্রযুক্তি সারের অপচয় কমাতে সহায়ক হতে পারে। সরাসরি বীজ বুনে ধান চাষ, যেখানে উপযোগী, সেখানে চারা রোপণের বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ধান কাটার সময় গোড়া থেকে সবকিছু পরিষ্কার না করে কিছু খড় জমিতে রেখে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিলে জৈব উপাদান ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
রাসায়নিক বালাইনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করাও টেকসই কৃষির অংশ। এটি শুধু নির্গমন প্রশ্নে নয়, মাটির স্বাস্থ্য, উপকারী জীববৈচিত্র্য এবং উৎপাদনব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার সঙ্গেও যুক্ত। কৃষককে কেবল নতুন পদ্ধতি গ্রহণের আহ্বান জানালেই হবে না; তাঁকে প্রশিক্ষণ, উপকরণ, পরামর্শ ও বাজারভিত্তিক সহায়তাও দিতে হবে।
খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশ সুরক্ষার যৌথ পথ
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভব করে সেই কৃষক, যাঁর জমি খরা, লবণাক্ততা, বন্যা বা অনিয়মিত বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ সেই কৃষিব্যবস্থার কিছু অংশ থেকেই আবার গ্রিনহাউস গ্যাস বের হয়। এই দ্বৈত বাস্তবতা বুঝে নীতিনির্ধারণ প্রয়োজন। কৃষিকে দায়ী করার বদলে তাকে কম-নির্গমন, জলবায়ু সহনশীল এবং লাভজনক পথে এগিয়ে নিতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হলো কম পানি, কম অপচয় এবং সুষম উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে একই জমিতে টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা। ধানখেত থেকে মিথেন কমানো মানে খাদ্য উৎপাদন কমানো নয়; বরং বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন, কৃষকের আয় এবং পরিবেশ—তিনটির মধ্যে ভারসাম্য গড়ে তোলার চেষ্টা। জলবায়ু সংকটের সময় কৃষিতে এই পরিবর্তন আর বিলম্বিত করার সুযোগ নেই।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is ক ষ ও গ র নহ উস?
ক ষ ও গ র নহ উস is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does ক ষ ও গ র নহ উস matter?
ক ষ ও গ র নহ উস matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.

